কিডনি রোগের ভয়াবহতা দিনে দিনে চরম রূপ নিচ্ছে

ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও তো ভয়াবহ মাত্রায় বাড়ছে?

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : মানুষ তার অভ্যাস পরিবর্তন করে ফেলছে। আর এ কারণেই ডায়াবেটিস বাড়ছে। আগে মানুষ ১০ কিলোমিটার হেঁটে বাজারে গেছে। এখন মানুষ আধা কিলোমিটার দূরে বাজারে যাবে, তার জন্য এক ঘণ্টা বসে থাকে রিকশা বা ভ্যানের জন্য। উন্নয়ন ঘটছে আর আমরা অলস হয়ে যাচ্ছি।

খেলার মাঠ নেই। বাচ্চারা স্কুলে আর খেলতে পারে না। খেলার সময় কই। বই, মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ আর ফেসবুক নিয়েই তো সময় পার। শারীরিক শ্রম তো নেই। এ কারণেই অল্প বয়সী মানুষের মাঝেও ডায়াবেটিস বাড়ছে। এতে করেই কিডনির সর্বনাশ হচ্ছে।

জাগো নিউজ : কিডনি রোগীর সংখ্যার কোনো তুলনা…

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : কী সংখ্যক রোগী কিডনি রোগে আক্রান্ত তার জরিপ করতে হলে তৃণমূলের হাসপাতাল থেকে তথ্য আসতে হবে। আমাদের এখানে পঞ্চম ধাপের রোগীরা আসেন। যখন কিডনি বিকল তখনই তারা এখানে আসেন। বিকল হওয়ার আগে আরও চারটি ধাপ অতিক্রম করে। আবার বিকল হওয়ার সবাই এখানে আসছেন না। এ কারণে কিডনি রোগীর সংখ্যা দেয়া মুশকিল।

জাগো নিউজ : কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে কী বলবেন?

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : সরকার যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন কিডনি রোগে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ রোগের চিকিৎসার জন্য অনেকগুলো দ্বার উন্মোচন করেছে।

যেমন অল্প বয়সে কেন ডায়াবেটিস হচ্ছে, উচ্চ রক্তচাপ হচ্ছে তার জন্য সরকার গবেষণা করছে। কারণ বের করে সমাধানের পথ খুঁজছে। কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা ক্লিনিকে এ নিয়ে সেবা দেয়া হচ্ছে, সচেতন করে তোলা হচ্ছে। ডায়াবেটিস এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে শতকরা অন্তত ৫০ ভাগ কিডনি রোগ কমে আসবে।

মানুষ অবশ্য আগের থেকে খানিক সচেতনও বটে। আগে শরীরে সামান্য ব্যথা হলেই ব্যথানাশক ওষুধ খেত। এখন অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খান না। এসব সচেতনার ব্যাপার। শরীর এবং রোগ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন করে কোনো লাভ নেই।

জাগো নিউজ : আপনার প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে কী বলবেন?

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে ১৫০ শয্যা ছিল। এখন এখানে ৪৫০ শয্যা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টির কারণেই এটি সম্ভব হচ্ছে।

তবে আমি মনে করি, কিডনি বিকল হওয়া রোগীর সংখ্যা যদি না কমাতে পারি, তাহলে এমন আশিটি হাসপাতাল করেও লাভ হবে না। সমাধানের জন্য মূলে যেতে হবে। কেন এ রোগ হচ্ছে, তা খুঁজে বের করে গোটা জাতিকে ভাবিয়ে তুলতে হবে।

আগে এখানে দিনে ৬০ জন রোগীর ডায়ালাইসিস হতো। এখন প্রতিদিন ৩০০ রোগীর ডায়ালাইসিস হচ্ছে। ডায়ালাইসিস হচ্ছে জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতেও। ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ কী। চাহিদা তো অসীম হয়ে যাচ্ছে। শরীর চর্চা এবং খাদ্যাভ্যাসে মনোযোগ দিতেই হবে। আগে মানুষ ফলমূল, শাক-সবজি খেত। এখন মানুষ তৈলাক্ত-ভাজাপোড়া খাবার খাচ্ছেন। বাচ্চারা মুটিয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই শরীরে হাজারো রোগ বাসা বাঁধছে।

জাগো নিউজ : আসন সংখ্যা নিয়ে রোগীর ক্ষোভ এখানে পুরানো?

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : আসন সংখ্যা তিনগুণ বাড়ানো হচ্ছে। আগে এত রোগী ছিল না। তিন হাজার করলেও আসন থাকবে না। কারণ রোগের মাত্রা না কমাতে পারলে কোনো কিছুই করে লাভ হবে না।

জাগো নিউজ : কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে কী বলবেন?

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডোনারের ক্যাটাগরি বাড়িয়ে দিয়ে আইন পাস করছে। আগে শুধু প্রথম রক্তের সম্পর্ক কিডনি দান করতে পারত। কিন্তু আপন ভাইও তো কিডনি দিতে চায় না।

তবে আমি মনে করি, কিডনি সংগ্রহের জন্য মৃত ব্যক্তির দিকে এখন নজর বাড়ানো দরকার। দেশে প্রতিবছর ৪০ হাজার লোক নানা দুর্ঘটনায় মারা যায়। এদের অনেকেই আইসিইউতে থাকে। তাদের অনেকেরই মস্তিষ্ক আর কাজ করে না। কিন্তু তার কিডনি সচল থাকে আরও ২৪ ঘণ্টা। এ সময়ের মধ্যে তার কিডনি সংগ্রহ করতে পারলে আরও দুটি মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।

জাগো নিউজ : এর জন্য আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা : সামাজিকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে। আর এর জন্য ধর্মীয় গুরু এবং গণমাধ্যমাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। মৃত ব্যক্তির কিডনিতে দুটি প্রাণ বাঁচবে এবং এখানে ধর্মীয় কোনো নিষেধ নেই তা মানুষকে বোঝাতে হবে। গণমাধ্যম তার দায়িত্বের মধ্য থেকেই বিস্তারিত লিখতে পারে।

কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট খরচও এখন কমে এসেছে। সরকার দায়িত্ব নিয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। আমাদের এখানেই এখন আন্তর্জাতিকমানের কিডনি রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার অগ্রগতির পাশাপাশি জনসচেতনা সৃষ্টি হলে কিডনি রোগ আরও কমে আসবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2019 bdsangbad71