টেস্ট ক্যারিয়ারে ব্যাট হাতে দ্বিশতক, বল হাতে দশ উইকেট

টেস্ট ক্যারিয়ারে ব্যাট হাতে দ্বিশতক, বল হাতে দশ উইকেট

প্রায় ২০০ বছরের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কয়জন ক্রিকেটার আছেন যারা ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন? কিংবা এক ম্যাচে দশ উইকেট নিয়েছেন? সংখ্যাটা যেমন কম নয়, তেমনি খুব বেশি নয়। তবে কয়জন ক্রিকেটার তার টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিশতক এবং দশ উইকেটের দেখা পেয়েছেন? এই সংখ্যাটা খুবই কম। ১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ প্রথম স্বীকৃত টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের পর থেকে মাত্র ছয়জন ক্রিকেটার এই অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছেন। এই তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের।

টেস্ট ক্রিকেটের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সেই সকল ক্রিকেটারদের নিয়ে আজকের প্রতিবেদন যারা অন্তত একবার হলেও হাঁকিয়েছেন দ্বিশতক, নিয়েছেন দশ উইকেট।

ভিনু মানকড় (ভারত)

ভারতের অলরাউন্ডার ভিনু মানকড় ৪৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন। তিনি তার টেস্ট ক্যারিয়ারে দু`টি দ্বিশতক হাঁকানোর পাশাপাশি দুইবার ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন। তিনিই প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে এই ডাবল পূর্ণ করেছিলেন। চেন্নাইতে ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০৮ রানের বিনিময়ে ১২ উইকেট শিকার করেছিলেন বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনার ভিনু মানকড়। একই বছরের ১৬ অক্টোবর দিল্লীতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩১ রানের বিনিময়ে ১৩ উইকেট শিকার করেছিলেন।

সেসময়কার সেরা অলরাউন্ডারদের একজন ছিলেন ভিনু মানকড়। তিনি ভারতের হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত মোট ৪৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে পাঁচটি শতক এবং ছয়টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৩১.৪৭ ব্যাটিং গড়ে ২,১০৯ রান সংগ্রহ করেছিলেন। বল হাতে ৩২.৩২ বোলিং গড়ে ১৬২ উইকেট শিকার করেছিলেন। ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকার করেছেন আটবার এবং ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছেন দুইবার।

স্যার ইয়ান বোথাম (ইংল্যান্ড)

ইয়ান বোথাম টেস্ট ক্রিকেটে ১৪টি শতক হাঁকিয়েছেন, এর মধ্যে একটি ছিল দ্বিশতক। ১৯৮২ সালে ৮ জুলাই ভারতের বিপক্ষে দ্য ওভালে ২২৬ বলে ১৯টি চার এবং চারটি ছয়ের মারে ২০৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন, যা টেস্ট ক্রিকেটে তার একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরি। তিনি বল হাতে ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছেন চারবার।

সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালের ২৪শে আগস্ট নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন। ম্যাচে তিনি ১৪০ রানের বিনিময়ে ১১ উইকেট পেয়েছিলেন। এরপর ১৯৭৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পার্থে ১৭৬ রানের বিনিময়ে ১১ উইকেট শিকার করেছিলেন। এর দুই ম্যাচ পর ভারতের বিপক্ষে ১৯৮০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইতে ভারতের বিপক্ষে ১০৬ রানের বিনিময়ে ১৩ উইকেট শিকার করেছিলেন, যা তার ক্যারিয়ারসেরা বোলিং বিশ্লেষণ। তার ক্যারিয়ারের চতুর্থ এবং শেষবারের মতো ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেন ১৯৮১ সালের ২৭শে আগস্ট। দ্য ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৫৩ রানের বিনিময়ে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন তিনি।

ইয়ান বোথাম তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ১০২টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। ১০২ ম্যাচে ১৪টি শতক এবং ২২টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৩৩.৫৪ ব্যাটিং গড়ে ৫,২০০ রান করেছিলেন। বল হাতেও তিনি ইংল্যান্ডের সেরা বোলার ছিলেন কয়েক যুগ ধরে। জেমস অ্যান্ডারসন এবং স্টুয়ার্ট ব্রড তাকে টপকানোর আগে ৩৮৩ উইকেট নিয়ে তিনিই ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন। ইনিংসে ২৭ বার পাঁচ উইকেট এবং চারবার ম্যাচে দশ উইকেট তুলে নিয়ে ২৮.৪০ বোলিং গড়ে ৩৮৩ উইকেট শিকার করেছিলেন।

অ্যালান বোর্ডার (অস্ট্রেলিয়া)

এই তালিকায় সবচেয়ে আশ্চর্যজনক অন্তর্ভুক্তি হলো অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডারের নাম। স্পেশালিষ্ট এই ব্যাটসম্যান অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ২৭টি শতক হাঁকিয়েছেন, উইকেট শিকার করেছেন মাত্র ৩৯টি। যার মধ্যে এক ম্যাচেই শিকার করেছেন ১১ উইকেট। শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঐ ম্যাচে ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে অস্ট্রেলিয়াকে জয় এনে দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৮৯ সালের ২৬শে জানুয়ারি, সিডনিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে মাঠে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথমে ব্যাট করা ওয়েস্ট ইন্ডিজের একপর্যায়ে রান সংখ্যা ছিলো এক উইকেট ১৪৪। সেখান থেকে ক্যারিবিয়ানদের ২২৪ রানে গুটিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব বোর্ডারের। তিনি মাত্র ৪৬ রানের বিনিময়ে সাত উইকেট শিকার করেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসেও তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের সামনের আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫০ রানে চার উইকেটসহ ম্যাচে ৯৬ রানের বিনিময়ে ১১ উইকেট শিকার করেছিলেন। ব্যাট হাতেও অস্ট্রেলিয়ার সাত উইকেটের জয়ে অবদান রেখেছিলেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ৭৫ রানের ইনিংস খেলার পর দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ১৬ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছান।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপের বিশ্বস্ত এই ব্যাটসম্যান বল হাতে নিয়মিত না হলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে ১১ উইকেট শিকার করে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ক্যারিয়ারে দ্বিশতক রানের ইনিংস খেলার পাশাপাশি ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করা ক্রিকেটারদের সংক্ষিপ্ত তালিকাতে নাম লেখিয়েছেন।

ওয়াসিম আকরাম (পাকিস্তান)

স্পেশালিষ্ট অলরাউন্ডার হিসাবে তার নামডাক না থাকলেও বোলিং অলরাউন্ডার হিসাবে বেশ কার্যকরী ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। টেল-এন্ডারে নেমে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সাকলাইন মুশতাকের সহায়তায় ক্যারিয়ারের একমাত্র দ্বিশতকও তুলে নেন।

১৯৯৬ সালের ১৭ অক্টোবর, পাকিস্তানের বিপক্ষে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে ৩৭৫ রান সংগ্রহ করেছিল জিম্বাবুয়ে। জবাবে পাকিস্তান ১৮৩ রান তুলতেই ছয় উইকেট হারিয়ে বসে। সেখান থেকে দলকে টেনে তুলেন ওয়াসিম আকরাম। ৮ম ব্যাটসম্যান হিসাবে ক্রিজে নেমে ৩৬৩ বলে ২২টি চার এবং ১২টি ছয়ের মারে অপরাজিত ২৫৭ রানের ইনিংস খেলে দলকে ৫৫৩ রানের সংগ্রহ এনে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছিলো।

সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)

গত এক যুগ ধরে ব্যাটে-বলে বাংলাদেশের প্রধান ভরসা সাকিব আল হাসান। তিনি একই সময়ে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হিসেবে রাজত্ব করেছেন বহুদিন। ইতিমধ্যে অনেক কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন তিনি, যার মধ্যে একটি হলো টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিশতক হাঁকানোর পাশাপাশি ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করা। এই তালিকাতে বেশ কয়েকজন আনকোরা অলরাউন্ডারের নাম রয়েছে। অনেক কিংবদন্তি অলরাউন্ডারও এই তালিকায় নিজেদের নাম লেখাতে পারেননি। কিন্তু সাকিব আল হাসান অন্য সব রেকর্ডের মতো এই রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন।

সাকিব আল হাসান টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন ২০১৪ সালের ৩রা নভেম্বর। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খুলনাতে ১২৪ রানের বিনিময়ে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন। এরপর ক্যারিয়ারের প্রথম এবং একমাত্র দ্বিশতক হাঁকিয়েছিলেন ২০১৭ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে। ওয়েলিংটনে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি শুরু হওয়া টেস্ট ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৭৬ বলে ৩১টি চারের মারে ২১৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিশতক হাঁকানোর পর সাকিব আল হাসান অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঢাকাতে ১৫৩ রানের বিনিময়ে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন। তিনি যে দুই ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছেন, ঐ দুই ম্যাচেই জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিশতক করেও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে দলের হার এড়াতে পারেননি। ব্যাট-বলে সমানভাবে দলের হয়ে অবদান রাখা এই অলরাউন্ডার এখন পর্যন্ত ৫৫টি টেস্টে ৩৯.৬৫ ব্যাটিং গড়ে ৩,৮০৭ রান করেছেন, এবং বল হাতে ২০৫ উইকেট তুলে নিয়েছেন।

জেসন হোল্ডার (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

২০১৯ সালের ২৩শে জানুয়ারি, ব্রিজটাউনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে হোল্ডার অপরাজিত ২০২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। টসে জিতে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৮৯ রান সংগ্রহ করেছিলো। জবাবে ক্যারিবিয়ান পেসারদের তোপের মুখে পড়ে মাত্র ৭৭ রানে অল আউট হয়ে ফলো-অনে পড়ে ইংল্যান্ড। তবে ইংল্যান্ডকে ফলো-অনের লজ্জা না দিয়ে দ্বিতীয়বার ব্যাট করতে নামার সিদ্ধান্ত নেন জেসন হোল্ডার। এই পিচে ব্যাট করা যে এত সহজ নয়, সেটা আরও পাকাপোক্ত হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংসে ১২০ রান তুলতেই ছয় উইকেট হারালে। টপ-অর্ডারের ছয় ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফিরে গেলে ব্যাট করতে নামেন হোল্ডার।

জেসন হোল্ডার ব্যাট হাতে মাঠে নামার পর অপর প্রান্তে থাকা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ডাওরিচের আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। এই দুইজন ৭ম উইকেট জুটিতে অবিচ্ছিন্ন ২৯৫ রানের জুটি গড়েছিলেন। এর মধ্যে জেসন হোল্ডার একাই করেন ২০২ রান। তিনি মাত্র ২২৯ বলে ২৩টি চার এবং আটটি ছয়ের মারে অপরাজিত ২০২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। ডাওরিচ অপরাজিত ছিলেন ১১৬ রানে। ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ৭৭ রানে সবকয়টি উইকেট হারানোর পরই ম্যাচের ফলাফল অনুমেয় ছিলো। হোল্ডার-ডাওরিচের জুটি ইংল্যান্ডকে লজ্জায় ডুবিয়ে ৩৮১ রানের বিশাল জয় এনে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিশতক হাঁকানোর পাঁচ মাস আগেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে দশ উইকেট শিকার করেছিলেন জেসন হোল্ডার।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2019 bdsangbad71