ঋণ থেকে মুক্তি পেতে সন্তান বিক্রি করলেন বাবা!

ঋণ থেকে মুক্তি পেতে সন্তান বিক্রি করলেন বাবা!

স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন শ্রমিক এহেছানুল্লাহ (৪৫)। নুন আনতে পানতা ফুরানো জীবনে প্রতি সপ্তাহে হাজার ১২শ কিস্তির টাকা কোনোভাবেই পরিশোধ করতে পারছিলেন না। এর মাঝেই এনজিও কর্মক’র্তারা তাকে টাকা পরিশোধের জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন বারবার। সংসারেও অশান্তি চলছিল এ নিয়ে।

ঋণ পরিশোধের চাপের মাঝেই এহেছানুল্লাহ পান ৫২ হাজার টাকার লো’ভনীয় প্রস্তাব। সন্তানহীন এক নারীকে ছেলেশি’শু এনে দিতে পারলেই মিলবে এই টাকা। ঋণ থেকে মুক্তি পেতে নিজের বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে টাকার জন্য নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দেন তিনি।

সন্তানকে বিক্রি করেই ক্ষান্ত হননি ঋণগ্রস্ত এহেছানুল্লাহ। সাজান ছেলে নি’খোঁজের নাট’ক। কখনো সন্তানের জন্য নিজের বউকে পাঠিয়েছেন বৈদ্য বাড়িতে। কখনো অ’ভিনয়ের ছলে সন্তানের জন্য ফেলেছেন চোখের পানি। ওঝার তাবিজ দোয়ায় সন্তানের খোঁজ মেলে এই আশাতেই মা দৌড়-ঝাঁপ করেছেন এখান থেকে ওখানে।

এভাবেই কে’টে গেছে টানা তিন মাস। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার সমাপ্তি ঘটেছে গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের রাউজান থানায়। তিন মাস পর রাব্বি ফিরে গেছে তার মায়ের কোলে।

বুধবার (২ অক্টোবর) দুপুরে যখন সাত বছরের শি’শু সন্তান রাব্বিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়ার সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এক সন্তানের জন্য আনন্দ আর অশ্রুতে ছলছল করছিল দুই মায়ের চার চোখ।এহেছানুল্লাহর বাড়ি কুমিল্লা জে’লার লাঙ্গলকোট থানার ভাঙ্গুরা ইউনিয়নে। তিনি স্থানীয় হাজী আবদুল মতিনের ছেলে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মক’র্তা (ওসি) অফিসার ইনচার্জ কেফায়েত উল্লাহ জাগো নিউজকে জানান, কুমিল্লায় এহেছানুল্লাহর স্ত্রী’-সন্তান থাকলেও গত আট বছর আগে তথ্য গো’পন করে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে আরও একটি বিয়ে করেন তিনি। ছোট স্ত্রী’ নাছিমা আকতার কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের মৃ’ত বদিউল আলমের কন্যা। তার এ সংসারে আছে রাব্বি ও এক কন্যা সন্তান।

বেশ কয়েক বছর ধরে এহেছানুল্লাহ রাউজানের কচুখাইন গ্রামের জাকির হোসেনের বাড়িতে কামলা হিসেবে কাজ করতেন। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে জাকির হোসেন তার বউয়ের বড় বোন বাছু আকতারের জন্য একটি ছেলে সন্তান কেনার আগ্রহ দেখালে টাকার লো’ভে পড়েন এহেছানুল্লাহ। তিন মাস আগে চট্টগ্রাম শহরে বেড়ানোর কথা বলে মহেশখালী থেকে স্ত্রী’ নাছিমাসহ দুই সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামের একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন এহেছান।

ওই দিন সকালে হোটেল থেকে ছেলে রাব্বিকে নিয়ে তিনি নগরেরর দিদার মা’র্কেট এলাকায় যান। সেখানে জাকির হোসেনের শালিকা বাছু আকতারের কাছে ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেলে রাব্বিকে বিক্রি করে দিয়ে হোটেলে ফিরে যান এহেছান। সেখানে স্ত্রী’কে কা’ন্নাকাটি করে বলেন, তার ছেলে হারিয়ে গেছে।

এ কথা শুনে ছেলের মা নাছিমা বিলাপ করে কা’ন্না জুড়ে দিলে সুচতুর এহেছানুল্লাহ তড়িঘড়ি করে মাইক ভাড়া নিয়ে ছেলের সন্ধানে চকবাজার বাদুরতলা এলাকায় মাইকিংও করেন। পরে স্ত্রী’ ও ছোট কন্যা সন্তানকে নিয়ে মহেশখালীতে চলে যান।

সেখানেও তিনি স্ত্রী’কে নিয়ে ছেলের সন্ধানে কিছু টাকা খরচ করে বৈদ্য ওঝার কাছে যান। সর্বশেষ স্ত্রী’কে শান্তনা দিয়ে এহেছানুল্লাহ কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলে মহেশখালী থেকে কক্সবাজারে গিয়ে সেখানে চাকরি নেন।

ওসি জানান, এর মাঝে দেখতে দেখতে কে’টে যায় তিন মাস। একদিন ছেলেহারা মা নাছিমা’র মাথায় আসে রাউজানের কচুখাইন গ্রামের জাকিরের সঙ্গে যোগাযোগের আইডিয়া। যেই ভাবা সেই কাজ, তিনি ঘর থেকে খুঁজে নেন স্বামীর দেয়া সেই সময়ের জাকিরের মোবাইল ফোন নম্বর। এদিকে ঘটনাক্রমে ওই ফোন নম্বরটি ছিল জাকিরের শালিকা প্রবাসী মোরশেদ খানের স্ত্রী’ বাছু আকতারের।

সেই ফোন নম্বরের সূত্র ধরে তার স্বামীর খোঁজ নেয়ার অজুহাতে বাছু আকতারের সাথে ফোনে কথা বলা শুরু করেন নাছিমা। কথার ফাঁকে নিজের ছেলে রাব্বি নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটি বাছু আকতারকে জানালে বাছু আকতার তাকে উল্টো জানান রাব্বি নামের এক শি’শুকে এহেছানুল্লাহ এনে তাদের কাছে বিক্রি করেছেন।

ওসি কেফায়েত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, রাব্বির খোঁজ পেয়েই ছেলেকে ফিরে পেতে মহেশখালীর জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সেখানকার থানায় ছুটে যান নাছিমা। স্থানীয়রা কৌশলে এহেছানুল্লাহকে থানায় ফোনে ডেকে আনে। পরে থানার পরাম’র্শে নাছিমাসহ তার আত্মীয়-স্বজনরা একজন গ্রাম পু’লিশকে সাথে নিয়ে রাউজান থানায় আমা’র কাছে আসে। রাউজান পু’লিশের একটি টিম ছেলেটিকে উ’দ্ধারে প্রথমে কচুখাইন গ্রামে যায়। সেখান থেকে কচুখাইনে এহেছানুল্লাহর সেই বাড়ির মালিক জাকির হোসেনকে আ’ট’ক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সকালে নগরের দিদার মা’র্কেট এলাকার বাছু আকতারের ঘর থেকে রাব্বিকে উ’দ্ধার করে পু’লিশ।

ওসি আরও বলেন, পু’লিশের কাছ থেকে পুরো ঘটনা জেনে রাব্বির নতুন মা বাছু আকতার নিজে রাউজান থানায় উপস্থিত হয়ে রাব্বিকে তারা মা নাছিমা’র কোলে তুলে দেন। সম্প্রতি রাব্বির জন্য কেনা নতুন কাপড়চোপড়-খেলনাসহ সবকিছু তার মায়ের হাতে তুলে দেন বাছু আকতার। এমনকি ছেলের বিনিময়ে দেয়া ৫২ হাজার টাকার দাবিও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।

এদিকে কোনো পক্ষ থেকে ঋণগ্রস্ত এহেছানুল্লাহর বি’রুদ্ধে অ’ভিযোগ না দেয়ায় তাকে ছেড়ে দিয়েছে পু’লিশ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2019 bdsangbad71